
সোহেল রানা :
ফেনীর মহিপালে এসএ পরিবহন কাউন্টারে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান, কোটি টাকার ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য উদ্ধার, গ্রেপ্তার পরিবহন শাখার দুই কর্মকর্তা।
ফেনীর মহিপাল এলাকায় অবস্থিত এসএ পরিবহন কাউন্টারে যৌথবাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভারতীয় চোরাচালানি মালামাল উদ্ধার এবং পরিবহন প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চোরাচালান, রাজস্ব ফাঁকি ও সংগঠিত অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান নেটওয়ার্কের অংশবিশেষ।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিজিবি, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ফেনীর মহিপাল এলাকায় এসএ পরিবহনের শাখা কার্যালয়ে এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে পরিবহন কাউন্টার ও সংরক্ষিত গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভারতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়। এ সময় চোরাচালান কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এসএ পরিবহনের মহিপাল শাখার ম্যানেজার মো. আতিকুর রহমান (৩৭) এবং সহকারী ম্যানেজার মো. ফারুক হোসেন (৩৫)-কে আটক করা হয়।
যৌথবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রসাধনী সামগ্রী, তেল, বডি স্প্রে, সাবান, টুথপেস্ট, ফেসওয়াশসহ বিপজ্জনক আতশবাজি। এসব পণ্য কোনো বৈধ আমদানি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) জানায়, জব্দকৃত মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ২ লাখ ১৫ হাজার ৮০০ টাকা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত বাজারমূল্য এর চেয়েও বেশি হতে পারে, কারণ চোরাচালানি পণ্য সাধারণত কম মূল্যে দেখিয়ে পরিবহন করা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
রাজস্ব ফাঁকির বড় অভিযোগ!
অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান এর মতে, এ ধরনের চোরাচালান সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে। বৈধ আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্কসহ বিভিন্ন খাতে সরকার রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু চোরাচালানের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশে প্রবেশ করলে এক টাকাও রাজস্ব পায় না সরকার।
ফেনীর এ ঘটনায় উদ্ধারকৃত পণ্যের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শাড়ি, থ্রি-পিস ও প্রসাধনী সামগ্রীতে আমদানি শুল্ক ও কর তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে একটি চালান থেকেই সরকারকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত করা সম্ভব হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যদি এভাবে নিয়মিত পণ্য পাচার হয়ে থাকে, তবে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে চোরাচালান?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন
, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোরাচালানকারীরা পরিবহন কাউন্টার, কুরিয়ার সার্ভিস ও গুদাম ব্যবস্থাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী পরিবহনের আড়ালে অবৈধ পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এমন কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়। ফেনীর মহিপাল এলাকার ঘটনাও সেই চিত্রের প্রতিফলন। যৌথবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এসএ পরিবহনের সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অবৈধ পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকলেও প্রাথমিক আলামত এই অভিযোগকে শক্তিশালী করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ফেনী একটি সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে চোরাচালানের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ভারত থেকে কাপড়, প্রসাধনী, আতশবাজি, ওষুধ ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব পণ্য দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় একদিকে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্র হারায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
চোরাচালান কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোক্তা নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। বিশেষ করে আতশবাজির মতো বিপজ্জনক পণ্য অবৈধভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
বিজিবির বক্তব্য :
ফেনী বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোশারফ হোসেন জানান, বিজিবি বর্তমানে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলেও সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের আভিযানিক কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা তৎপরতা কঠোরভাবে অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে বিজিবি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, আটককৃত দুই ব্যক্তি এবং জব্দকৃত মালামাল পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফেনী সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
এসব পণ্য কোথা থেকে এবং কীভাবে সীমান্ত পার হয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে আর কারা জড়িত
।আগেও এ ধরনের চালান পরিবহন করা হয়েছে কি না। রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ কত।
কোনো সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সক্রিয় আছে কি না। মানি লন্ডারিং ও অর্থপাচারের দিকটিও তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে বলে জানা গেছে।
ফেনীর মহিপালে এসএ পরিবহন কাউন্টারে যৌথবাহিনীর এই অভিযান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থা, কুরিয়ার সার্ভিস বা যেকোনো বাণিজ্যিক কাঠামো ব্যবহার করে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালানো হলে তার পরিণতি অনিবার্য।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা মনে করেন - নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো গেলে শুধু চোরাচালানই নয়, রাজস্ব ফাঁকি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। অনুসন্ধান চলবে…
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/