
কক্সবাজার প্রতিনিধি:
জেলায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম এখন উন্নয়নের প্রতীক না হয়ে ভুক্তভোগী মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ও হয়রানির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সরকারি নীতিমালা ও আইনি বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে আলোচনায় এস আলমের গুপ্ত দালাল সিন্ডিকেট ক্ষতিপূরণের অর্থ আটকে রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছ থেকে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, জমি অধিগ্রহণের আগে বা দ্রুততম সময়ে প্রকৃত মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং পর্যটন উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ৫ থেকে ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও বহু পরিবার এখনও ক্ষতিপূরণ পায়নি।
এলএও অফিস ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ
জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার (এলএও) অফিসকে কেন্দ্র করে গুপ্ত এস আলমের পরিচয়ে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। অভিযোগ রয়েছে, ফাইল জমা দেওয়ার পরই শুরু হয় হয়রানি—এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোরানো, নতুন কাগজপত্রের অজুহাত, পুনঃজরিপের নামে বিলম্ব এবং ইচ্ছাকৃত জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুষ ছাড়া ফাইল অগ্রসর হয় না।
চিহ্নিত দালাল খালেক হোসাইন সিকদারের দৌরাত্ম্য
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলএও অফিসের অন্যতম সক্রিয় দালাল হিসেবে পরিচিত খালেক হোসাইন সিকদার দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বহু ভূমি মালিককে সর্বস্বান্ত করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—ভুয়া খতিয়ান তৈরি, ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা, এমনকি নির্ভেজাল জমিতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে থেকে কক্সবাজার শহরের কলাতলি এলাকায় অবস্থান করছেন এবং আড়ালে থেকেই তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এলএও অফিস ও আদালতপাড়ায় দালালি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও মামলার ওয়ারেন্ট থাকলেও এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব পরিবার
রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষ অভিযোগ করেছেন, বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে খালেক হোসাইন সিকদার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা দিলে দ্রুত চেক পাওয়া গেলেও টাকা না দিলে বছরের পর বছর ফাইল আটকে থাকে বলে অভিযোগ।
ইদগাহ ইউনিয়নের বাসিন্দা জানান, “চেক প্রস্তুত হওয়ার পরও দালালদের টাকা না দিলে চেক হাতে পাওয়া যায় না।” এ বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেছেন।
প্রশাসনিক পদক্ষেপেও থামেনি সিন্ডিকেট
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এলএও অফিসের দুইজন দালাল গ্রেফতার হলেও প্রধান অভিযুক্ত খালেক হোসাইন সিকদার পালিয়ে যান। ফলে দালাল সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
উল্লেখ্য, অতীতে ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির দায়ে কক্সবাজারের এক সাবেক জেলা প্রশাসক কারাভোগ করলেও পুরো ব্যবস্থায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। বরং দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবেতর জীবনযাপন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই বসতভিটা ও জীবিকার উৎস হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ ঋণের বোঝায় জর্জরিত, কেউ দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। পুনর্বাসনের অভাবে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি—
দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ
প্রকৃত মালিকদের যাচাই করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান
এলএও অফিসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা
তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, “উন্নয়নের নামে যদি মানুষের জীবন ধ্বংস হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন।”
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/