
সোহেল রানা :
সরকারি খাস জমি, ভাওয়াল রাজ এস্টেটের সম্পত্তি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুলসহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও সাক্ষ্য–প্রমাণে উঠে এসেছে, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর একাধিক কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে জমির প্রকৃত মালিকানা, আদালতে চলমান মামলা ও স্থিতিবস্থার তথ্য গোপন করে অবৈধভাবে নকশা অনুমোদন ও নির্মাণ ছাড়পত্র গ্রহণ করেছেন।
দুদকের উপসহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুন বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার মামলাটি দায়ের করেন বলে সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। মামলায় আলোচিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলাসহ রাজউকের উচ্চ ও মধ্যপর্যায়ের বহু কর্মকর্তা আসামি হয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে রূপায়ণ হাউজিং জনৈক মোস্তফা জামানের সঙ্গে ২ দশমিক ৫১ একর জমির সমঝোতা চুক্তি করলেও জমির মূল্য পরিশোধ না করেই মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে আদালতের স্থিতিবস্থা জারি থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে রাজউক থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন আদায় করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, রূপায়ণ হাউজিং রাজউকের পাঁচ ধাপে মোট ৪১ দশমিক ৫৪৮ একর জমির ওপর বিশেষ প্রকল্পের অনুমোদন নেয়। অথচ রাজউকে জমা দেওয়া নথিতে তাদের বৈধ জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৩২ একর। বাকি ২৫ দশমিক ২২৮ একর জমির কোনো বৈধ মালিকানা দলিল তারা দেখাতে পারেনি।
এছাড়া মহানগর জরিপের ৪ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ২ দশমিক ৩৫ একর ভাওয়াল রাজ এস্টেটের সম্পত্তি এবং রানাভোলা মৌজার সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমিও রূপায়ণ নিজেদের দখলে নিয়েছে বলে প্রমাণ পায় দুদক। এমনকি ড্যাপ অনুযায়ী নির্ধারিত ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়কও প্রকল্পের সীমানার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আদালত নিযুক্ত আরবিট্রেটর ২০১৮ সালে অভিযোগকারীকে ১৯২ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিলেও রূপায়ণ তা পরিশোধ করেনি। পরবর্তীতে ঢাকা জেলা জজ আদালত ওই রোয়েদাদ বহাল রেখে পুনরায় স্থিতিবস্থা জারি করলেও প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী বিশেষ প্রকল্পের জন্য নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সত্যায়িত দলিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু আদালতের আদেশ ও জমির প্রকৃত অবস্থা গোপন করে ভুয়া রেকর্ড দাখিলের মাধ্যমে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রূপায়ণ হাউজিংয়ের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল ও ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা ছাড়াও মামলার অনান্য আসামিরা হলেন- (২) রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের পরিচালক ও লিয়াকত আলী খান মুকুলের স্ত্রী রোকেয়া বেগম নাসিমা, (৩) রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের পরিচালক ও লিয়াকত আলী খান মুকুলের পুত্র মাহির আলী খান রাতুল (৪). রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের পরিচালক ফরিদা বেগম, (৫). রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের পরিচালক আলী আকবর খান রতন, (৬). রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের এস্টেট অফিসার সাজ্জাদ হুসাইন।
রাজউক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন, (৭). রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উপ-নগর পরিকল্পবিদ কামরুল হাসান সোহাগ, (৮). রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার রেখাকার মো. আলমগীর কবীর (৯). রাজউকের উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম, (১০). রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার নকশাকার মো. এমদাদুল হক মুনসী, (১১). রাজউকের ফটোগ্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট এমরান হোসেন সুমন, (১২). রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার ড্রাফটসম্যান মো. নাজমুল হক, (১৩). রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান (এনডিসি), (১৪). রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) ও বিসি কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান, (১৫). রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল মান্নান, (১৬). রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বিসি কমিটি-২/এ-এর সদস্য মো. মোবারক হোসেন, (১৭). গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বিসি কমিটির সদস্য আব্দুল্লাহ মো. জুবাইর (১৮). গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল, (১৯). রাজউকের উপ-নগর স্থপতি মোস্তাক আহমদ।
এছাড়াও রয়েছেন- (২০). রাজউকের পরিচালক (আইন) মো. রোকন উদদৌলা, (২১). রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী ও বিসি কমিটি-২-এর সদস্য মো. এমদাদুল ইসলাম, (২২). রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ও বিসি কমিটির সদস্য সচিব গোলাম মোস্তফা, (২৩). রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ও বিসি কমিটির সদস্য ড. মুহাম্মদ মোশরফ হোসেন, (২৪). রাজউকের পরিচালক (জোন-২) আনন্দ কুমার বিশ্বাস, (২৫). রাজউকের অথরাইজড অফিসার (সাময়িক বরখাস্ত) মো. মিজানুর রহমান, (২৬). রাজউকের অথরাইজড অফিসার ও বিসি কমিটি ২/এ-এর সদস্য সচিব মো. পারভেজ খাদেম, (২৭). রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. আশরাফুল ইসলাম আহমেদ, (২৮). রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল করিম, (২৯). বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজউকের সহকারী আইন পরামর্শক মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, (৩০). জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সহকারী স্থপতি ও বিসি কমিটির সদস্য মো. তাওফিকুজ্জামান, (৩১). রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার জান্নাতুল নাইমা, (৩২). রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার তামান্না বিনতে রহমান, (৩৩). রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার এস এম এহসানুল ইমাম, (৩৪). রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. খায়রুজ্জামান, (৩৫). রাজউকের প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. আব্দুস সালাম, (৩৬). রাজউকের প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. আব্দুল গনি, (৩৭). রাজউকের নকশা অনুমোদন শাখার প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. বিল্লাল হোসেন, (৩৮). রাজউকের নকশা অনুমোদন শাখার পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম, (৩৯). রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মো. মাসুদুর রহমান, (৪০). রাজউকের প্রধান ইমারত পরিদর্শক আবু শামস রকিব উদ্দিন আহমেদ, (৪১). রাজউকের সহকারী পরিদর্শক (এস্টেট ও ভূমি) জ্ঞানময় চাকমা, (৪২). রাজউকের এস্টেট পরিদর্শক তৌফিকুল ইসলাম এবং (৪৩). রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার জরিপকার মো. আলী আজগর সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে থাকার সুযোগ নেই। অবিলম্বে অবৈধভাবে দখলকৃত জমি রাষ্ট্রের অধীনে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া উচিত। জনগণের সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হওয়া প্রয়োজন।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/